হাবরার বিস্ময় শিশু আভ্যান দাসের বিশ্বজয়
হাবরা: কথায় আছে, ‘জহুরিই চেনে জহর’। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনার হাবরার আড়াই বছরের শিশু আভ্যান দাসের ক্ষেত্রে জহুরি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; তার প্রখর স্মৃতিশক্তি আর মেধার বিচ্ছুরণ যে কাউকেই মুহূর্তের মধ্যে অবাক করে দিতে যথেষ্ট। যে বয়সে সমসাময়িক শিশুরা কেবল খেলনা আর কার্টুন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সে হাবরার এই খুদে বিস্ময় বালক নিজের নাম খোদাই করে নিল ‘ইনফ্লুয়েনসার বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’-এর পাতায়। ধারণা করা হচ্ছে, আড়াই বছর বয়সী কোনো শিশুর এমন বহুমুখী প্রতিভার জেরে এই সম্মান প্রাপ্তি বাংলা থেকে সম্ভবত প্রথম। আভ্যানের এই কৃতিত্ব আজ তাকে আক্ষরিক অর্থেই ‘বাংলার গৌরব’-এ পরিণত করেছে।
আদর্শ লিপি থেকে বিশ্ব রেকর্ড: এক অভাবনীয় যাত্রাপথ
আভ্যানের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল অতি অল্প বয়সেই। কথা পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার আগেই সে আয়ত্ত করে ফেলেছিল ‘আদর্শ লিপি’র কঠিন পাঠ। বইয়ের পাতা উল্টে ছবি দেখে নাম বলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন তথ্য মনে রাখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত ভাবেই পেয়েছে এই খুদে। বর্তমানে আভ্যান তার অবিশ্বাস্য মেধার পরিচয় দিচ্ছে বহুমুখী প্রতিভায়:
- ত্রিভাষিক জ্ঞান: বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি—তিনটি ভাষার বর্ণমালা সে অনায়াসে চিনতে ও বলতে পারে।
- বিস্ময়কর শব্দভাণ্ডার: দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত ১০০-রও বেশি জিনিসের ইংরেজি নাম তার নখদর্পণে।
- গণিতের গতি: মাত্র ৯০ সেকেন্ড বা দেড় মিনিটের মধ্যে সে ১ থেকে ৫০ পর্যন্ত নির্ভুলভাবে গুনে শেষ করতে পারে।
- মন্ত্রপাঠ: শুদ্ধ উচ্চারণে তিনটি জটিল মন্ত্র পাঠ করার ক্ষমতা তাকে অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।

সাফল্যের নেপথ্যে: বাবা-মায়ের নিষ্ঠা ও একাগ্রতা
আভ্যানের এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের কারিগর তার বাবা-মা। মূলত তাঁদের সজাগ দৃষ্টি এবং ধৈর্যই এই খুদে প্রতিভাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। সাধারণত এই বয়সের শিশুদের হাতে অনেক বাবা-মা স্মার্টফোন তুলে দিলেও, আভ্যানের ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তার মা লক্ষ্য করেছিলেন, আভ্যানের শ্রবণশক্তি ও কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতা প্রবল। তাই খেলার ছলে তাঁরা তাকে বিভিন্ন তথ্য শেখাতে শুরু করেন। বাবা-মায়ের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সঠিক গাইডেন্সেই আভ্যান আজ শংসাপত্র ও মেডেলের পাহাড় গড়তে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের কথায়, “আমরা কোনোদিন ওকে জোর করে কিছু শেখাতে চাইনি। ও নিজে থেকেই শিখতে ভালোবাসে। ওর এই বিশ্ব রেকর্ডের খবর আমাদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।”
জাতীয় সম্মান ও পুণেতে রাজকীয় সংবর্ধনা
আভ্যানের মেধা কেবল ঘরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সম্প্রতি সে ‘Olympiad Young Achievers’-এর আয়োজিত জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় ‘স্টার পারফর্মার’ শিরোপা জিতেছে। তার এই জয়যাত্রাকে কুর্নিশ জানাতে আগামী জুন মাসে মহারাষ্ট্রের পুণেতে একটি বিশেষ রাজকীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করা হবে।
বাংলার গর্ব ও আগামীর স্বপ্ন
আভ্যান দাসের এই যাত্রা কেবল একটি রেকর্ডের গল্প নয়, এটি আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাবরার একটি মফস্বল থেকে উঠে এসে সে যেভাবে বাংলার নাম উজ্জ্বল করল, তা সত্যি অনুপ্রেরণাদায়ক। আড়াই বছরের এই ‘খুদে ইনফ্লুয়েনসার’ এখন পুণে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সারা বাংলা এখন প্রহর গুনছে সেই মুহূর্তের, যখন বাংলার গৌরব আভ্যান পুণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশবাসীকে আরও একবার চমকে দেবে।
Share this content:


