Loading Now

মস্কোর সামরিক বিধিতে বড় বদল: যুদ্ধের প্রয়োজনে এবার একে অপরের জমি ব্যবহার করবে ভারত ও রাশিয়া

গত কয়েক দশক ধরে ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে ‘সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বন্ধুত্ব’ বলা হলেও, ২০২৬ সালের এই নতুন চুক্তি সেই সম্পর্ককে ‘সামরিক সহাবস্থান’-এর স্তরে উন্নীত করেছে। মস্কোর পক্ষ থেকে সরকারিভাবে চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশের পর এটা স্পষ্ট যে, নয়াদিল্লি ও ক্রেমলিন একে অপরকে কেবল কৌশলগত অংশীদার নয়, বরং ‘নিরাপত্তা বলয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

১. চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা: কী থাকছে এই নথিতে?

এই চুক্তিটি মূলত একটি Reciprocal Logistics Support Agreement (RLSA) বা পারস্পরিক লজিস্টিক সহায়তা চুক্তি, তবে এর পরিধি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত।

  • সামরিক ঘাঁটির অবাধ ব্যবহার: ভারতীয় সেনা এখন রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য (Far East) অঞ্চলের বন্দর এবং আর্কটিক সাগরের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে। বিনিময়ে রাশিয়ার জাহাজ ও বিমান ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মতো কৌশলগত অবস্থানে জ্বালানি ও রসদ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
  • আকাশসীমার সমন্বয়: চুক্তি অনুযায়ী, বিশেষ মহড়া বা মানবিক সহায়তার প্রয়োজনে দুই দেশের যুদ্ধবিমান পূর্বানুমতির জটিলতা ছাড়াই একে অপরের আকাশসীমা ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। এটি দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন ‘সামরিক করিডোর’ তৈরি করবে।
  • প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব: রাশিয়ার সহযোগিতায় ভারতে তৈরি হওয়া S-400 মিসাইল সিস্টেম, সুখোই ফাইটার জেট বা ব্রহ্মোস মিসাইল-এর মতো সমরাস্ত্রের খুচরো যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ এখন আরও সহজ হবে। ভারতের মাটিতেই এসবের ‘হাব’ তৈরি করার বিষয়টি চুক্তিতে বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়েছে।

২. কূটনৈতিক বিশ্লেষণ: কেন এই চুক্তি এখন?

ক. চিনের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ (The China Factor)

রাশিয়া ও চিনের বর্তমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য একটি অস্বস্তির কারণ ছিল। কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া স্পষ্ট বার্তা দিল যে, বেজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও দিল্লির সাথে তাদের ‘বিশেষ কৌশলগত সম্পর্ক’ অটুট। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার উপস্থিতি ভারতের নৌবাহিনীকে চিনা প্রভাব মোকাবিলায় বাড়তি সুবিধা দেবে। আবার লাদাখ বা উত্তর-পূর্ব সীমান্তে উত্তেজনার সময় রাশিয়ার কাছ থেকে দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো।

খ. পশ্চিমা বিশ্ব ও আমেরিকার সাথে ভারসাম্য

ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে আমেরিকা ও ইইউ দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার সাথে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করে প্রমাণ করল যে, নয়াদিল্লি কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ নয়। এটি ভারতের ‘Multi-aligned’ বা বহু-মেরু নীতির একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার সাথে যেমন ভারতের ‘iCET’ চুক্তি রয়েছে, তেমনি রাশিয়ার সাথে এই সামরিক চুক্তি ভারতকে বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষাকারী (Pivot) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।

গ. মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রবেশদ্বার

এই চুক্তির ফলে রাশিয়ার মধ্য এশীয় সামরিক পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ ভারতের জন্য খুলে যেতে পারে। আফগানিস্তান এবং সংলগ্ন অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় রাশিয়ার সাহায্য এখন সরাসরি লজিস্টিক সাপোর্টের মাধ্যমে পাওয়া যাবে।

৩. অর্থনৈতিক ও শিল্পগত প্রভাব: ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ থেকে ‘সেল টু ওয়ার্ল্ড’

চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো—রাশিয়ার প্রযুক্তিতে ভারতে নির্মিত অস্ত্র তৃতীয় কোনো বন্ধু রাষ্ট্রে রফতানির ক্ষেত্রে মস্কোর ‘নির্দোষপত্র’ বা ক্লিয়ারেন্স।

  • প্রতিরক্ষা রফতানি: ভারত এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে রুশ প্রযুক্তির উন্নত অস্ত্র রফতানি করে বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। এটি ভারতের অর্থনীতিতে প্রতিরক্ষা খাতের অবদানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
  • যৌথ উদ্ভাবন: কেবল কেনা-বেচা নয়, পরবর্তী প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির ক্ষেত্রে দুই দেশ এখন সরাসরি একে অপরের পরীক্ষাগার ও টেস্টিং গ্রাউন্ড ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

৪. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ

এই চুক্তির ফলে ভারতের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে CAATSA (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) জাতীয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি। তবে ভারত সরকার ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের বিশাল বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে আমেরিকা ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে।
অন্যদিকে, এই চুক্তি কার্যকর করতে গিয়ে গত ডিসেম্বরে রাশিয়ার সামরিক বিধিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে মস্কো ভারতকে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেই দেখছে। এটি কেবল সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, বরং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সুনিপুণ চাল।

২০২৬-এর এই প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্ককে কেবল ক্রেতা-বিক্রেতা থেকে সরিয়ে ‘সহ-যোদ্ধা’র আসনে বসিয়েছে। আকাশসীমা থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের বন্দর পর্যন্ত এই অংশীদারিত্ব আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র নিয়ন্ত্রণ করবে। দিল্লির কূটনৈতিক পরিপক্কতা এবং মস্কোর দীর্ঘমেয়াদী কৌশল—উভয়ই এই চুক্তির মাধ্যমে পূর্ণতা পেল।

Share this content:

শুভদীপ দাস বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার জগতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিজ্ঞান শাখায় স্নাতকের পর সাংবাদিকতার নেশাতেই এই পেশায় আসা। পেশাগত সাংবাদিকতার পাশাপাশি শুভদীপ দাস একজন সখের আলোকচিত্রী এবং চিত্রশিল্পী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজ থেকে অন্ধ কুসংস্কার ও কুপ্রথা নির্মূল করে একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সর্প সচেতনতা বিষয়ে তাঁর কাজ প্রশংসনীয়। সাপে কাটা রোগীদের সঠিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পেতে সহায়তা করা এবং সাপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে তিনি মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

You May Have Missed