অশোকনগর : ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আজ চরম অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর-কল্যাণগড়ের প্রাচীন ব্রিটিশ সামরিক বিমানঘাঁটি ও সংলগ্ন পরিকাঠামো এখন জরাজীর্ণ। এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং হেরিটেজ তকমা দিয়ে সংরক্ষণের দাবিতে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারস্থ হলেন শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় ছাত্রসমাজ।
ইতিহাসের পাতায় অশোকনগর বিমানঘাঁটি

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপান ও অক্ষশক্তির মোকাবিলায় ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনীর জন্য এই অঞ্চলটি ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় যুদ্ধবিমান ওঠানামা ও নজরদারির স্বার্থে এখানে বিশালাকার বিমানঘাঁটি ও রানওয়ে তৈরি করা হয়েছিল। দেশভাগের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়ের দূরদর্শী পরিকল্পনায় এই পরিত্যক্ত সেনাছাউনি ও বিমানঘাঁটির বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরেই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে পরিকল্পিত উপনগরী অশোকনগর-কল্যাণগড়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও ধ্বংসের রূপরেখা

বর্তমানে এই অঞ্চলের রানওয়ে, যুদ্ধবিমান রাখার বিশালাকার হ্যাঙ্গার, ওয়াচ টাওয়ার বা লাইট হাউস, সেনাকর্মীদের ব্যবহারের জলের ট্যাঙ্ক এবং ঐতিহাসিক শহিদ বেদি চরম দুরবস্থায় রয়েছে।
- জবরদখল ও আগাছা: রানওয়ে ও হ্যাঙ্গার চত্বরের অনেকটাই আগাছায় ঢেকে গেছে, কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল ও অবৈধ দখলদারির সমস্যা।
- প্রশাসনিক উদাসীনতা: দীর্ঘ সময় ধরে কোনো স্থায়ী সংরক্ষণ বা নজরদারি না থাকায় মূল্যবান ব্রিটিশ স্থাপত্যগুলি ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
অতীতের ঐতিহ্য, ভবিষ্যতের সম্পদ

অশোকনগর শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতাতেই বন্দি নয়, আধুনিক ভারতের মানচিত্রেও এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এই মাটির নিচেই লুকিয়ে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ—’তরল সোনা’ বা খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি (ONGC) ইতিমধ্যে এখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করেছে। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাস, ড. বিধানচন্দ্র রায়ের পরিকল্পিত আধুনিক শহর, আর অন্যদিকে দেশের জ্বালানি মানচিত্রে অশোকনগরের এই আত্মপ্রকাশ— অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধনে এই অঞ্চল সমগ্র বাংলার এক অনন্য গৌরবময় স্থান হয়ে উঠেছে।
সংরক্ষণের দাবিতে চিঠি

ঐতিহাসিক এই নিদর্শনগুলিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উদ্যোগী হয়েছেন নেতাজি শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষা ড. শতাব্দী বিশ্বাস। তিনি কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় যুবসমাজকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও সংস্কৃতি মন্ত্রকে বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়েছেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে:
- এলাকাটিকে দ্রুত জাতীয় ঐতিহ্যের (Heritage Site) স্বীকৃতি দিয়ে সংরক্ষণ করা।
- জরাজীর্ণ হ্যাঙ্গার ও রানওয়ের সংস্কার করে একটি ঐতিহাসিক মিউজিয়াম বা প্রদর্শনীশালা নির্মাণ।
- নতুন প্রজন্মের গবেষণার সুবিধার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলের ভূমিকার নথিপত্র সংরক্ষণ।
স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমীদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে অশোকনগরের এই ব্রিটিশ আমলের বিমানঘাঁটি উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একদিকে তেলের খনি হিসেবে অর্থনৈতিক উত্থান এবং অন্যদিকে ব্রিটিশ আমলের বিমানঘাঁটির যথাযথ সংরক্ষণ — এই দুইয়ে মিলে অশোকনগর পূর্ব ভারতের মানচিত্রে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে ওঠার সব রসদ বহন করছে। এখন দেখার, কেন্দ্রীয় সরকার এই ঐতিহ্য রক্ষায় কত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।