Loading Now

কমল গণনা কেন্দ্র : ২৯৪ আসনের ভোট গোনা হবে ৮৭টি কেন্দ্রে, কোন জেলায় কোথায় কোথায় গণনা?

নিজস্ব প্রতিবেদন | কলকাতা
১৮ এপ্রিল, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই সাজ সাজ রব রাজ্য রাজনীতিতে। তবে এবারের নির্বাচনে ভোটগণনা প্রক্রিয়ায় বড়সড় রদবদল আনল ভারতের নির্বাচন কমিশন। বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে গণনাকেন্দ্র বা কাউন্টিং সেন্টারের সংখ্যা। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পরিসংখ্যানের বিবর্তন: এক নজরে গণনাকেন্দ্র

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬—এই ১০ বছরে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যায় বড় ওঠা-পড়া দেখা গিয়েছে:

  • ২০১৬ বিধানসভা: ৯০টি কেন্দ্র।
  • ২০২১ বিধানসভা: ১০৮টি কেন্দ্র (কোভিড পরিস্থিতির কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল)।
  • ২০২৬ বিধানসভা: ৮৭টি কেন্দ্র।
    কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৯৪টি বিধানসভা আসনের ভাগ্য নির্ধারিত হবে এই ৮৭টি কেন্দ্রে। মূলত পরিকাঠামো সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা বলয় আরও নিশ্ছিদ্র করতেই এই ‘কনসোলিডেশন’ বা কেন্দ্র একত্রীকরণ করা হয়েছে।

জেলাভিত্তিক গণনাকেন্দ্রের মানচিত্র

রাজ্যের জেলাগুলোতে বিধানসভা আসনের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রগুলো বণ্টন করা হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেই সবচেয়ে বেশি নজরদারি থাকছে।

১. উত্তর ২৪ পরগনা (সর্বাধিক ৩৩ আসন)

এই জেলায় আসন সংখ্যা বেশি হওয়ায় ৮টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলি হলো:

  • বারাসত কলেজ ও পিয়ারিচরণ সরকার হাই স্কুল।
  • বসিরহাট হাই স্কুল ও পলিটেকনিক কলেজ।
  • বিধাননগর কলেজ এবং ব্যারাকপুরের রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজ।
  • বনগাঁর দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়।

২. দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৩১ আসন)

এখানে মোট ১২টি কেন্দ্রে গণনা হবে। ঠাকুরপুকুরের বিবেকানন্দ কলেজ, কসবার গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম এবং যাদবপুরের এপিসি রায় পলিটেকনিক কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এই তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়াও সুন্দরবন ও ডায়মন্ড হারবার সংলগ্ন এলাকাগুলোর জন্য নির্দিষ্ট মহাবিদ্যালয়গুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

৩. কলকাতা (১১ আসন)

কলকাতার ক্ষেত্রে মাত্র ৫টি কেন্দ্রে গণনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম বরাবরের মতোই হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র হিসেবে থাকছে। পাশাপাশি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল এবং সেন্ট থমাস বয়েজ় স্কুলেও চলবে ভোটগণনা।

৪. উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহল

  • জলপাইগুড়ি: ৭টি আসনের জন্য মাত্র ২টি কেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়)।
  • ঝাড়গ্রাম: ৪টি আসনের জন্য একটিই কেন্দ্র— রানি ইন্দিরা দেবী সরকারি স্কুল।
  • কালিম্পং: মাত্র একটি আসনের গণনা হবে স্কটিশ উইনিভার্সিটিস মিশন ইনস্টিটিউশনে।

কেন এই সংখ্যা হ্রাস? কমিশনের যুক্তি ও পাল্টা চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা কমানোর পিছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:
১. নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা: কেন্দ্র কম হলে প্রতিটি কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীর (CAPF) ঘেরাটোপ আরও মজবুত করা সম্ভব। সিসিটিভি নজরদারি এবং ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখা সহজ হয়।
২. প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি টেবিলের লাইভ কাস্টিং এবং সার্ভারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কাছে ডেটা পাঠানোর প্রক্রিয়াটি আরও কেন্দ্রীভূত করা।
৩. প্রশাসনিক সুবিধা: গণনাকর্মী এবং মাইক্রো-অবজারভারদের ব্যবস্থাপনা একটি নির্দিষ্ট বড় চত্বরে করা প্রশাসনিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক।
বিরোধী শিবিরের সংশয়:
তবে গণনাকেন্দ্র কমানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধীদের একাংশ। তাদের আশঙ্কা, কেন্দ্র কমলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ভিড় বাড়বে এবং দূরবর্তী এলাকা থেকে ব্যালট বক্স বা ইভিএম পৌঁছাতে সময় বেশি লাগলে কারচুপির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যদিও কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে, স্ট্রং রুম থেকে গণনাকেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ জিপিএস এবং কড়া পাহারায় মোড়া থাকবে।

এক নজরে অন্যান্য জেলার গণনাকেন্দ্র সংখ্যা:

জেলাআসন সংখ্যাগণনাকেন্দ্র
মুর্শিদাবাদ২২০৬
পূর্ব বর্ধমান১৬০৩
পশ্চিম মেদিনীপুর১৫০৪
মালদহ১২০২
বীরভূম১১০৩
হাওড়া১৬০৪

২০২৬-এর নীলবাড়ির লড়াইয়ের ফলাফল কোন দিকে যাবে, তা বলবে সময়। তবে গণনাকেন্দ্র কমিয়ে আনার মাধ্যমে কমিশন যে অত্যন্ত কড়া হাতে গণনার দিনটি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তা স্পষ্ট। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই ৮৭টি কেন্দ্রে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েনের কাজ শুরু হবে বলে নবান্ন সূত্রে খবর। উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে এই ‘অঙ্ক’ ভোট গণনায় কতটা স্বচ্ছতা আনে, সেটাই এখন দেখার।

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন: জেলাভিত্তিক আসন ও গণনাকেন্দ্রের তালিকা

ক্রমিক নংজেলার নামমোট বিধানসভা আসননির্ধারিত গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা
উত্তর ২৪ পরগনা৩৩০৮
দক্ষিণ ২৪ পরগনা৩১১২
মুর্শিদাবাদ২২০৬
হুগলি১৮০৬
নদিয়া১৭০৪
পূর্ব বর্ধমান১৬০৩
পূর্ব মেদিনীপুর১৬০৪
হাওড়া১৬০৪
পশ্চিম মেদিনীপুর১৫০৪
১০বাঁকুড়া১২০৩
১১মালদহ১২০২
১২কলকাতা১১০৫
১৩বীরভূম১১০৩
১৪উত্তর দিনাজপুর০৯০২
১৫পশ্চিম বর্ধমান০৯০২
১৬পুরুলিয়া০৯০৩
১৭কোচবিহার০৯০৫
১৮জলপাইগুড়ি০৭০২
১৯দক্ষিণ দিনাজপুর০৬০২
২০দার্জিলিং০৫০৩
২১আলিপুরদুয়ার০৫০১
২২ঝাড়গ্রাম০৪০১
২৩কালিম্পং০১০১
মোট২৩টি জেলা২৯৪৮৭
  • সর্বোচ্চ আসন ও কেন্দ্র: উত্তর ২৪ পরগনায় সর্বোচ্চ ৩৩টি আসন থাকলেও, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (১২টি)। এর কারণ মূলত ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।
  • সর্বনিম্ন কেন্দ্র: কালিম্পং এবং ঝাড়গ্রামের মতো জেলায় গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা ১টি করে।
  • পরিবর্তন: ২০২১ সালের নির্বাচনে গণনাকেন্দ্র ছিল ১০৮টি, যা এবার ২১টি কমিয়ে ৮৭টি করা হয়েছে।
    এই তালিকা অনুযায়ী আগামী ৪ মে, ২০২৬ তারিখে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোট গণনা সম্পন্ন হবে।

Share this content:

শুভদীপ দাস বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার জগতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিজ্ঞান শাখায় স্নাতকের পর সাংবাদিকতার নেশাতেই এই পেশায় আসা। পেশাগত সাংবাদিকতার পাশাপাশি শুভদীপ দাস একজন সখের আলোকচিত্রী এবং চিত্রশিল্পী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজ থেকে অন্ধ কুসংস্কার ও কুপ্রথা নির্মূল করে একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সর্প সচেতনতা বিষয়ে তাঁর কাজ প্রশংসনীয়। সাপে কাটা রোগীদের সঠিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পেতে সহায়তা করা এবং সাপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে তিনি মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

Previous post

HABRA | বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: হাবরায় এবার দ্বিমুখী লড়াই, উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির প্রশ্নে সরগরম রাজনৈতিক ময়দান

Next post

মস্কোর সামরিক বিধিতে বড় বদল: যুদ্ধের প্রয়োজনে এবার একে অপরের জমি ব্যবহার করবে ভারত ও রাশিয়া

You May Have Missed