News Flash

দুই শতাব্দী পেরিয়ে আজও অমলিন: গোবরডাঙার ঐতিহ্যবাহী ‘মশলা মেলা’

শুভদীপ দাস
Elite Contributor
রাজ্য
Share Story:

দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট— নববর্ষের পুণ্যলগ্নে বুধবার সকাল থেকেই রাজ্যের প্রতিটি তীর্থস্থানে উপচে পড়া ভিড়। অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তির আবাহনে মেতেছে বঙ্গবাসী। ব্যবসায়ীদের দোকানে দোকানে চলছে হালখাতা পুজো। কিন্তু এই চেনা ছবির বাইরেও উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙায় দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। দুইশ বছরেরও বেশি প্রাচীন প্রথা মেনে বছরের প্রথম দিনে সেখানে বসল ঐতিহ্যবাহী ‘মশলা মেলা’

মেলার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস

আজ থেকে প্রায় ২০৪ বছর আগে, ১৮২৩ সালে এই মেলার সূচনা করেছিলেন গোবরডাঙার তৎকালীন জমিদার খেলারাম মুখোপাধ্যায়ের পুত্র কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন জমিদার বাড়ির পাশের মাঠে এই মেলার পত্তন হয়।

নাম: গোষ্ঠ বিহার মশলা মেলা।

উদ্দেশ্য: কৃষকরা নববর্ষের প্রথম দিনে তাঁদের উৎপাদিত ফসল সরাসরি বিক্রি করবেন এবং সেই লভ্যাংশ দিয়ে জমিদারের খাজনা মেটাবেন— এই ভাবনা থেকেই মেলার শুরু।
বর্তমানে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, নেই খাজনা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও। কিন্তু ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে আজও অম্লান এই মেলা।

ভোররাত থেকেই কেনাবেচার ধুম

পয়লা বৈশাখের ভোর তিনটে! যখন গোটা শহর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই জেগে ওঠে এই মশলা হাট। দূর-দূরান্ত থেকে কৃষকরা তাঁদের জমির টাটকা ফসল নিয়ে হাজির হন। মেলায় পাওয়া যায়:

  • শুকনো লঙ্কা ও হলুদ।
  • জিরে, ধনে ও হরেক রকমের গোটা মশলা।
  • কৃষকদের উৎপাদিত বিবিধ রবিশস্য।

আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু কেন?

১. সস্তা দর: খোলা বাজারের তুলনায় এই মেলায় মশলার দাম অনেকটাই কম থাকে। ফলে সাধারণ মানুষ এখান থেকে সারা বছরের রান্নার মশলা মজুত করে নেন।
২. ব্যবসায়িক বিশ্বাস: স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস, বছরের প্রথম দিন এই মেলা থেকে মশলা কিনে ব্যবসা শুরু করলে সারা বছর লক্ষ্মীলাভ হবে।
৩. আবেগ ও ঐতিহ্য: গোবরডাঙার মানুষের কাছে এটি কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং এক নস্টালজিয়া।

উৎসবের আমেজ

মেলার পাশেই অবস্থিত প্রাচীন প্রসন্নময়ী কালী মন্দির। নববর্ষের সকালে একদিকে মন্দিরে চলে বিশেষ পুজো আর অন্যদিকে চলে মশলার দরদাম। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে গোবরডাঙার নববর্ষ উদযাপন রাজ্যের অন্য যে কোনও প্রান্তের চেয়ে আলাদা।
জমিদারি আমলের সেই কর আদায়ের মেলা আজ রূপ নিয়েছে মিলন উৎসবে। যুগের পরিবর্তন হলেও, গোবরডাঙার বাসিন্দারা তাঁদের এই প্রাচীন উত্তরাধিকারকে আজও সযত্নে আগলে রেখেছেন।

The Elite Weekly

Get curated premium content delivered straight to your inbox.

এই লেখাটি লিখেছেন…

শুভদীপ দাস

শুভদীপ দাস বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার জগতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। বিজ্ঞান শাখায় স্নাতকের পর সাংবাদিকতার নেশাতেই এই পেশায় আসা। পেশাগত সাংবাদিকতার পাশাপাশি শুভদীপ দাস একজন সখের আলোকচিত্রী এবং চিত্রশিল্পী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজ থেকে অন্ধ কুসংস্কার ও কুপ্রথা নির্মূল করে একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সর্প সচেতনতা বিষয়ে তাঁর কাজ প্রশংসনীয়। সাপে কাটা রোগীদের সঠিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পেতে সহায়তা করা এবং সাপ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে তিনি মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।