বিশেষ সংবাদদাতা, অশোকনগর: সমস্ত লড়াই, প্রার্থনা আর অগণিত মানুষের শুভকামনাকে ব্যর্থ করে চিরতরে থেমে গেল এক অদম্য জীবনযুদ্ধ। বিরল মাংসপেশীর ক্যানসার ‘র্যাবডোমায়োসারকোমা’ (Rhabdomyosarcoma)-র কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর কল্যাণগড় পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১৯ বছর বয়সি তরুণী পায়েল হালদার। স্বপ্ন ছিল সাংবাদিক হওয়ার, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের আগেই মুম্বইয়ের হাসপাতালে নিভে গেল তাঁর জীবনপ্রদীপ।
পরেশ হালদার ও মিতালী হালদারের ছোট মেয়ে পায়েলের ক্যানসার প্রথম ধরা পড়ে ২০২৩ সালে, যখন তিনি অশোকনগর বাণীপীঠ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। কলকাতার টাটা মেডিক্যাল সেন্টারে প্রায় দেড় বছরের দীর্ঘ ও কঠিন চিকিৎসার পর অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অদম্য জেদ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন অশোকনগর নেতাজী শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে। শৈশব থেকেই সাংবাদিক হওয়ার তীব্র ইচ্ছে ছিল তাঁর।
চলতি বছরেই রোগটি পুনরায় মারাত্মক রূপ নিয়ে ফিরে আসে। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ২ লক্ষ টাকার বিশেষ ইনজেকশনের প্রয়োজন ছিল, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন পায়েল; মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে একটি চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, অন্য চোখেও কমে আসে দৃষ্টিশক্তি। শ্বাসকষ্টের জন্য নিতে হচ্ছিল অক্সিজেনের সাপোর্ট। সেই অবস্থাতেই মোবাইলে টাইপ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি আবেদন জানিয়েছিলেন— ‘আমি বাঁচতে চাই।’
পায়েলের সেই আকুতি দেখে অশোকনগরসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। অগণিত মানুষের অর্থসাহায্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানে তাঁকে মুম্বই নিয়ে যাওয়া হয়।
মুম্বইয়ে পৌঁছানোর পর থেকেই পায়েলের শারীরিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। অসহ্য যন্ত্রণায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। প্লেটলেট কম থাকায় চিকিৎসকেরা জরুরি কেমোথেরাপি শুরু করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পায়েল। মুম্বই থেকে কার্গো বিমানে তাঁর মরদেহ কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়।
পায়েলের অকাল প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর পরিবার, প্রতিবেশী এবং সহপাঠীদের মধ্যে। নেতাজী শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়াত ছাত্রীর স্মরণে দুটি বিশেষ উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে:
- ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যানসার নিয়ে একটি বিশেষ সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজন করা হবে।
- সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে পায়েলের স্মৃতিতে একটি বার্ষিক ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও স্মৃতি স্মারক পুরস্কার চালু করা হবে।
মরদেহ এলাকায় পৌঁছাতেই শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা অশোকনগরে। তাঁর শেষ যাত্রায় পা মেলান এলাকার বহু সাধারণ মানুষ ও সহনাগরিক। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয় নেতাজী শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও। কলেজের অধ্যাপিকা ডঃ শতাব্দী বিশ্বাস ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে প্রয়াত ছাত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তাঁর সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্নটা অধরা থেকে গেলেও, বাঁচার জন্য তাঁর এই লড়াই বহু মানুষের হৃদয়ে চিরকাল থাকবে।