খেলার মাঠ দখলের অভিযোগ’ বিতর্ক : অভিযুক্তকে ৩ মাসের ডেডলাইন দিল CPDR
নিজস্ব প্রতিনিধি, উত্তর ২৪ পরগনা: এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ। প্রথম থেকেই যেখানে খেলাধুলো করে আসছেন গ্রামবাসীরা। আচমকাই সেই মাঠে পড়ল ‘দখলের ছায়া’। উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের ইছাপুর-২ পঞ্চায়েতের অন্তর্গত বোরা কৃষ্ণনগর এলাকায় খেলার মাঠের জমি দখলকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অনৈতিকভাবে মাঠের জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ঘটনার সুষ্ঠু মীমাংসায় মাঠে নামতে হয়েছে ‘কনজিউমার প্রোটেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক রাইটস’ (CPDR) সংগঠনকে।
গ্রামবাসীদের গুরুতর অভিযোগ ও রাজনৈতিক যোগ:
স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকাংশেরই অভিযোগ, অভিযুক্ত প্রশান্ত বিশ্বাস ও তাঁর পরিবার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় একাধিক জমি বেআইনিভাবে দখল করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গ্রামের এই একমাত্র খেলার মাঠটি এতদিন অনৈতিকভাবে দখল করে রেখেছিলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের দাবি, স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও নথি সূত্রে জানা গেছে, এই মাঠের জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিতর্ক নতুন কিছু নয়। মূলত ১৯৫৮ সালের আগে থেকেই ঠাকুরনগর অঞ্চলের এই খেলার মাঠ সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে জমি বিবাদ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই পুরোনো আইনি ও সামাজিক জটিলতাকে ঢাল করেই নতুন করে মাঠটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ। বিগত কয়েক বছর ধরে ওই জমিতে খেলাধুলো করতে গেলে বিশ্বাস পরিবারের লোকজন তাঁদের ভয় দেখাত ও বাধা দিত। তবে রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর, এখন নির্ভয়ে নিজেদের খেলার মাঠ ফিরে পেতে চান গ্রামবাসীরা। মাঠ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা সিপিডিআর (CPDR)-এর দ্বারস্থ হন।
অভিযুক্ত পক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন:
অভিযোগের ভিত্তিতে ইছাপুর-২ পঞ্চায়েত প্রধানের উপস্থিতিতে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অভিযুক্ত পক্ষের প্রতিনিধি বিকাশ বিশ্বাসের কাছে জমির সপক্ষে সমস্ত বৈধ নথিপত্র পেশ করার দাবি জানানো হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি। বিশ্বাস পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জমির প্রয়োজনীয় নথিপত্র অতীতে কোনো এক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গিয়েছিল, তাই নতুন করে তা তৈরি করতে সময় লাগবে। জমিটি তাঁদেরই নিজস্ব এবং সেখানে তাঁরা চাষবাস করতে গিয়েছিলেন। উল্টে গ্রামবাসীরাই তাঁদের চাষের ফসল নষ্ট করেছেন বলে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে বিশ্বাস পরিবার। নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে তিন মাসের সময় চেয়েছেন।
ভূমি রাজস্ব দফতরের দিকে আঙুল সিপিডিআর-এর:
বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সমস্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখার পর মূল অভিযোগের আঙুল স্থানীয় বিএলআরও (BLRO) বা ভূমি রাজস্ব দফতরের আধিকারিকদের দিকে তুলেছেন সিপিডিআর-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অতীন্দ্র ঘোষ। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সরকারি অফিসারেরা এই সরকারি বা খাস জমির কাগজ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে করে দিয়েছেন। আর সেই কারণেই আজ এই জটিল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সিপিডিআর (CPDR)-এর সিদ্ধান্ত ও অন্তর্বর্তী নির্দেশিকা:
দীর্ঘ আলোচনার পর সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অতীন্দ্র ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দেন:
- যিনি এই জমিটি ব্যক্তিগত বলে দাবি করছেন, তিনি যদি আগামী তিন মাসের মধ্যে উপযুক্ত ও বৈধ কাগজ দেখাতে পারেন, তবে গ্রামবাসীরা সানন্দে এই জমি তাঁকে ছেড়ে দেবেন।
- কিন্তু তিন মাসের মধ্যে উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে না পারলে, এই জমিটি স্থায়ীভাবে গ্রামবাসীদের খেলার মাঠ হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
- আপাতত এই জমিতে কোনো ধরনের স্থায়ী কনস্ট্রাকশন বা কনক্রিটের গাঁথুনির কাজ করা যাবে না।
- মাঠে গ্রামের মানুষ আগের মতোই খেলাধুলো, পুজো-আচ্চা ও সামাজিক অনুষ্ঠান করতে পারবেন। বিশ্বাস পরিবারের কেউ এতে কোনো বাধা দিতে পারবেন না।
ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি:
সিপিডিআর-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মেটানোর পক্ষপাতী হলেও উচ্চতর আইনের পথ খোলা রাখছেন। আগামী তিন মাসে যদি এই সমস্যার স্থায়ী মীমাংসা না হয়, তবে পরবর্তীতে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন। সংগঠনের সদস্যরা আশ্বস্ত করেছেন, প্রয়োজনে গ্রামবাসীদের স্বার্থে তাঁরা আবারও এলাকায় আসবেন।
বৈঠক শেষে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
সিপিডিআর-এর এই হস্তক্ষেপে এবং অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তে গ্রামবাসীরা অত্যন্ত খুশি হলেও, বিশ্বাস পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। মাঠের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা জানতে এখন আগামী তিন মাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বোরা কৃষ্ণনগর গ্রাম।
Share this content: