হিমালয়ের কোলে ফের প্রকৃতির ভয়াল তাণ্ডব। বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীর বুকে আকস্মিক হড়পা বানে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। কাঠমান্ডু প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পানির তীব্র স্রোতে ইতিমধ্যেই অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২৯১ জন বিদেশি-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পুণ্যার্থী ও পর্যটক, যাঁদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয় নাগরিক (৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় সহ)। নিখোঁজ ভারতীয়রা প্রত্যেকেই কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন।
এই বিপর্যয়ের অভিঘাত এসে পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গেও। তিব্বত সীমান্ত পারাপারের মুখে থাকা কলকাতার ৩২ জনের একটি পর্যটক দল পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিখোঁজ হয়ে পড়েছে। গত ২১ তারিখ কলকাতা থেকে রওনা দেওয়া ওই দলে ৩০ জন পর্যটক এবং ২ জন ভ্রমণ সংস্থার কর্মী ছিলেন; তাঁদের মধ্যে একজন অনাবাসী ভারতীয়ও রয়েছেন। বুধবার সকালে সীমান্ত অভিবাসন দফতরে থাকাকালীন দুর্যোগের কবলে পড়েন তাঁরা। হড়পা বানের তোড়ে রাসুয়ার পাশাপাশি নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তিব্বতের সীমান্ত লাগোয়া জিরং স্থলবন্দরও কাদামাটির স্রোতে বিধ্বস্ত হয়েছে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের পেছনে প্রাথমিক কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ধারাবাহিক ভূপ্রাকৃতিক ঘটনা। স্থানীয় সময় সকালে তিব্বতীয় ভূখণ্ডে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার ঠিক পরেই সেখানে বিশাল তুষারধস নামে। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ ও কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে, তুষারধসে পাথর ও বরফের স্তূপ পড়ে লেহন্দে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে পেছনে জমে থাকা বিপুল জলরাশি প্রচণ্ড চাপে প্রাকৃতিক সেই বাঁধ ভেঙে আছড়ে পড়ে ভোটেকোশী নদীতে, যা পরে গিয়ে মেশে ত্রিশুলি নদীতে। পাশাপাশি কোনও হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার ফলেও জলের তীব্রতা বহু গুণ বেড়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। বানের তোড়ে বহু সেতু, পাকা রাস্তা ও বসতবাড়ি ভেসে গিয়েছে, যা ১৯৯৮ সালের পিথোরাগড়ের মলপা ধসের ভয়াবহ স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিপর্যয়ের খবর পাওয়া মাত্রই নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পাশে থাকার বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ জরুরি ওষুধ, খাবার, অস্থায়ী তাঁবু ও আলো-সহ ১০ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার ‘সি১৩০জে’ বিশেষ বিমান কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে এবং সি-১৭ বিমানকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আটকে থাকা ভারতীয়দের খবরাখবর জানার জন্য ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক দুটি জরুরি নম্বর (+৯৭৭৯৮৫১৩১৬৮০৭ এবং +৯৭৭৯৭০৯১০৭৫০০) চালু করেছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সুবিধার্থে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে রাজ্য পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের সদর দফতরে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম ও হেল্পলাইন খোলা হয়েছে। যোগাযোগের নম্বরগুলি হলো:
- রাজ্য পুলিশ সদর দফতর: ০৩৩-২৪৭৯৩৩১১ / ৯১৪৭৮৯০১৮১ / ০৩৩-২৪৭৯৪০৪৪ / ৯১৪৭৮৯০১৪৬
- কলকাতা পুলিশ হেল্পলাইন: ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮
- ডিজি কন্ট্রোল: ৯১৭৪৮৯০১৪৫
- হোয়াটসঅ্যাপ সহায়তা: ৯৮৭৪৯০২৮৮০
হিমালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি নদীগুলিতে জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে জারি হয়েছে উচ্চ সতর্কতা। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী গণ্ডক ও কোশী নদী অববাহিকায় থাকা পশ্চিম ও পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, মুজফ্ফরপুর সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাঁধ ও জলস্তরের ওপর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) ও সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-কে সতর্ক রাখা হয়েছে। অন্য প্রান্তে, তিব্বতের জিরং বন্দরে কাদামাটির স্রোতে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজের নির্দেশ দিয়েছেন। নিখোঁজদের সন্ধান ও আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে বর্তমানে দুই দেশের প্রশাসন জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।